নয়ন জুড়ানো নীলসাগর

নাম শুনে মনে হতে পারে নীল রঙের জলে পরিপূর্ণ কোন সাগরের নাম ‘নীলসাগর’। না, নীলও নয়, সাগর নয়, নয়ন জুড়ানো বিপুল জলরাশির কারণে সবাই তাকে নীলসাগর বলে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমণ্ডিত বিশাল এই দীঘিটি নীলফামারী জেলার প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। ১৯৯৯ সালের ৭ ডিসেম্বর নীলসাগরকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এই দীঘির নামেই ‘নীলসাগর’ নাম নামকরণ করা হয়েছে নীলফামারী-ঢাকা পথে চলাচল করা আন্তঃনগর বিলাসবহুল ট্রেনের।


একনজরে নীলসাগর

নীলফামারী জেলার সদর উপজেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ধোবাডাঙ্গা মৌজায় ৫৩.৯০ একর জমির ওপর নীলসাগরের অবস্থান। এর জলভাগ ৩২.৭০ একর, এবং চারদিকের পাড়ের জমির পরিমাণ ২১ একরের মতো। নীলফামারী জেলা শহরের জিরো পয়েন্ট চৌরঙ্গী মোড় থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নীলফামারী-দেবীগঞ্জ-পঞ্চগড় সড়কের পাশে এ দীঘির অবস্থান।


নামকরণ

জনশ্রুতি আছে যে, প্রায় ৫২০০ বছর পূর্বে এই দীঘিটি খনন করা হয়েছিল। মহাভারতে বর্ণিত বিরাট রাজা কুরক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত হলে তাকে এই দীঘির পাড়ে সমাহিত করা হয়। বিরাট রাজার দীঘি কালক্রমে ‘বিরনাদীঘি’ এবং সি.এস জরিপকালে ‘বিন্নাদীঘি’ নামে পরিচিত হয়। আরেকটি জনশ্রুতি আছে খ্রিস্টপূর্ব নবম হতে অষ্টম শতাব্দীতে পাণ্ডবরা কৌরবদের চক্রান্তের শিকার হয়ে ১২ বছরের বনবাস ও ১ বছরের অজ্ঞাতবাসে যেতে বাধ্য হন এবং মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের রাজধানীর এ স্থানটিতে ছদ্মবেশে বসবাস শুরু করেন। মনে করা হয়, সে-সময় নির্বাসিত পাণ্ডবদের তৃষ্ণা মেটাতে বৈদিক রাজা বিরাট এ দিঘিটি খনন করেছিলেন। বিরাটদীঘি’র অপভ্রংশ হিসেবে কালক্রমে এ দিঘিটি ‘বিরাটদীঘি’, ‘বিল্টাদীঘি’ এবং অবশেষে ‘বিন্নাদীঘি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কারো কারো মতে, রাজা বিরাট তার বিশাল গরুর পালের জন্য পানির সংস্থান করতেই এ দিঘি খনন করেন এবং তার কন্যা বিন্নাবতীর নামে এর নামকরণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে নীলফামারীর তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক এম.এ জব্বার কর্তৃক এই দীঘিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় ও নীলফামারীর নামানুসারে ‘বিন্নাদীঘি’র পরিবর্তে এর নামকরণ করা হয় ‘নীলসাগর’।


নীলসাগরের আকর্ষণ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই মূলত নীলসাগর বিখ্যাত। মনোরম এই দীঘিটির পাড় ঘিরে রয়েছে নারকেল, বনবাবুল, আকাশমণি, মেহগনি, শিশুসহ নানা ধরনের ফুল ও ফলের গাছ। এখানে পানি আর সবুজ মিলে সৃষ্টি হয় এক অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্যের। ছায়াঘেরা দীঘির চারপাশ বাঁধানো। শান বাঁধানো দীঘির চারপ্রান্তে রয়েছে সিঁড়ি। দীঘির পাড়ে পাকা রাস্তার কিছুদূর পর পর দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে সুদৃশ্য বিশ্রামাগার, ছাতাসহ বসার স্থান। এখানে শিশুদের জন্য দোলনা, নাগরদোলারও ব্যবস্থা রয়েছে। শীতকালে সাইবেরিয়াসহ শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে আসা অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। মাঝদীঘিতে বসে ভিনদেশি হাজার পাখির মেলা। দীঘিতে ফোটা শাপলার ফাঁকে ফাঁকে পাখির জলকেলি প্রকৃতিতে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। দীঘির শান্ত আর নিরিবিলি পরিবেশ যাদের ভালো লাগে তাদের বেড়াতে যাওয়ার চমৎকার একটি স্থান হল এটি। নীলসাগরে প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে সনাতন হিন্দু সম্প্রদায় বারুণী স্নান উৎসবের আয়োজন করে থাকে। এই উপলক্ষে মেলাও বসে সেখানে। নীলসাগরে দর্শনার্থীদের জন্য টিকেটের মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ৫ টাকা। মাছ শিকারিদের দুটি বড়শির ফি এক হাজার টাকা।


যাতায়াত

বাসে কিংবা ট্রেনে নীলফামারী শহরে আসার পর দেবীগঞ্জগামী বাস ছাড়াও রিকশাভ্যান, মাইক্রোবাস এবং মোটর সাইকেলে করে অনায়াসে যাওয়া যায় নীলসাগরে। আকাশপথে যেতে চাইলে বিমানে সৈয়দপুর, তারপরে সেখান থেকে সড়ক পথে নীলফামারী।
থাকা-খাওয়া: নীলসাগরে অভ্যন্তরে রেস্ট হাউসে থাকতে চাইলে আগাম জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি নিতে হবে। এখানে কিন্তু খাওয়ার জন্য আলাদা কোন রেস্টুরেন্ট নেই। তবে রেস্টহাউস কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। এছাড়া জেলা সদরে এবং সৈয়দপুরে বিভিন্ন মানের বেশ কিছু হোটেল এবং রেস্টহাউস আছে।


সতর্কতা

সাঁতার না জানলে বাহাদুরি দেখাতে যাবেন না যেন! নীলসাগরের গভীরতা কমসে কম ২০-২৫ ফিট তো হবেই!
আরো যা দেখার আছে: নীলসাগর ছাড়াও নীলফামারী জেলা অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থান হল: চিনি মসজিদ, কুন্দ পুকুর মাজার, নীলফামারী যাদুঘর , হরিশ্চন্দ্রের পাঠ, ভীমের মায়ের চুলা, নীল কুঠি, ধর্মপালের রাজবাড়ী এবং ময়নামতির দুর্গ।

Leave a Comment