পাঁচগাও, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা

বাংলাদেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের এক নিভৃত জনপদ—পাঁচগাও। প্রশাসনিকভাবে এটি কলমাকান্দা উপজেলার অন্তর্গত, যা আবার নেত্রকোনা জেলার সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চল। শহরের কোলাহল, কংক্রিটের দেয়াল আর ব্যস্ত জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে পাঁচগাও যেন সময়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা করা এক গ্রাম—যেখানে প্রকৃতি এখনো মানুষের আগে কথা বলে।

পাঁচগাওয়ের পথে যাত্রা মানেই ধীরে ধীরে সভ্যতার শব্দ থেকে সরে আসা। নেত্রকোনা শহর পেরিয়ে কলমাকান্দার দিকে এগোতেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত, আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা, আর দূরে নীলচে পাহাড়ের রেখা। বর্ষাকালে এ পথ যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে—হাওরের জল উপচে পড়ে, ছোট ছোট খাল আর ডোবা একাকার হয়ে যায়। তখন পাঁচগাও শুধু একটি গ্রাম নয়, হয়ে ওঠে জল ও জীবনের এক চলমান ক্যানভাস।

পাঁচগাও, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা

ভৌগোলিকভাবে পাঁচগাও এক অনন্য অবস্থানে। একদিকে মেঘালয়ের পাহাড়ঘেঁষা টিলা, অন্যদিকে হাওরাঞ্চলের বিস্তৃত জলরাশি। এই দুই ভিন্ন ভূপ্রকৃতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে গ্রামটি প্রকৃতির এক ভারসাম্যপূর্ণ রূপ তুলে ধরে। বর্ষায় যেখানে জল আর আকাশ মিশে যায়, শীতকালে সেখানে ধানক্ষেতের সোনালি ঢেউ চোখ জুড়িয়ে দেয়। প্রকৃতির এই রূপান্তর পাঁচগাওকে প্রতি ঋতুতেই নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ দেয়।

পাঁচগাওয়ের মানুষজন সহজ, স্বল্পভাষী কিন্তু আন্তরিক। এখানকার জীবনের গতি শহরের তুলনায় অনেক ধীর—কিন্তু সেই ধীরতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর স্থিতি। ভোরবেলায় আজানের ধ্বনি কিংবা পাখির ডাক দিয়ে দিন শুরু হয়। কৃষক মাঠে যায়, জেলেরা জাল কাঁধে হাওরের দিকে হাঁটে, আর বাড়ির আঙিনায় নারীরা সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই দৈনন্দিন চিত্রে কোনো নাটকীয়তা নেই, আছে বাস্তব জীবনের স্বচ্ছতা।

পাঁচগাও, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা

গ্রামের অর্থনীতি মূলত কৃষি ও মৎস্যনির্ভর। ধান এখানকার প্রধান ফসল, পাশাপাশি শীতকালে সরিষা, ডাল ও শাকসবজির চাষ হয়। বর্ষায় হাওরে পাওয়া যায় দেশি মাছ—রুই, কাতলা, শিং, মাগুর—যা শুধু খাদ্য নয়, অনেক পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। পাহাড়ি ঢল এলে কখনো কখনো ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, তবু মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, বরং সহাবস্থান করেই বাঁচতে শিখেছে।

পাঁচগাওয়ের সামাজিক জীবনও আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। এখানে মানুষ এখনো উৎসবকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়। ঈদ, পূজা কিংবা নবান্ন—সব উপলক্ষেই গ্রাম যেন এক বড় পরিবারের রূপ নেয়। উঠানে উঠানে রান্নার আয়োজন, শিশুদের হাসি, বয়স্কদের গল্প—সব মিলিয়ে এক ধরনের হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতির সাক্ষ্য পাওয়া যায়। আধুনিক প্রযুক্তি গ্রামে ঢুকেছে বটে, কিন্তু তা এখনো পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি সম্পর্কের উষ্ণতা।

পাঁচগাও, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা

শিক্ষা ও সচেতনতার দিক থেকে পাঁচগাও ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের বাইরে যেতে হয়। তবু নতুন প্রজন্মের চোখে স্বপ্ন আছে—শহরে গিয়ে পড়াশোনা করা, চাকরি করা, আবার সুযোগ পেলে নিজের গ্রামে কিছু একটা করে ফেলা। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই পাঁচগাওয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠছে।

এই গ্রাম কোনো পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিত নয়, কিন্তু প্রকৃতির নিভৃত সৌন্দর্য আর মানুষের সহজ জীবনযাপন যাদের টানে, তাদের জন্য পাঁচগাও এক অনাবিষ্কৃত গন্তব্য। এখানে এলে বিলাসিতা নেই, আছে প্রশান্তি। পাঁচগাও শেখায়—সব উন্নতি উচ্চ অট্টালিকায় নয়, কখনো কখনো কাঁচা রাস্তার ধুলোর মধ্যেও জীবনের গভীর অর্থ লুকিয়ে থাকে।

পাঁচগাও, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা

পাঁচগাওয়ের ইতিহাস কোনো লিখিত দলিলে বিস্তৃতভাবে সংরক্ষিত না হলেও মানুষের স্মৃতি, গল্প আর মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনির মধ্যেই এর অতীত বেঁচে আছে। প্রবীণদের কাছে শোনা যায়, একসময় এই অঞ্চলে বসতি ছিল বিচ্ছিন্ন ও অল্পসংখ্যক। পাহাড় থেকে নেমে আসা মানুষ, হাওরের পাড়ে মাছ ধরে জীবন চালানো জেলে পরিবার এবং কৃষিকাজে অভ্যস্ত কয়েকটি গোষ্ঠী মিলেই ধীরে ধীরে পাঁচগাওয়ের সমাজ গড়ে ওঠে। “পাঁচগাও” নামের উৎপত্তি নিয়েও নানা লোককথা রয়েছে—কারও মতে পাঁচটি পাড়াকে কেন্দ্র করে এই গ্রামের নামকরণ, আবার কেউ বলেন পাঁচটি প্রধান পরিবার থেকেই এই জনপদের সূচনা।

প্রাকৃতিক পরিবেশ পাঁচগাওয়ের জীবনধারাকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি নানা চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। পাহাড়ি ঢল এখানকার মানুষের জন্য পরিচিত বাস্তবতা। বর্ষার শুরুতেই মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা হঠাৎ পানি কখনো কখনো ফসলের মাঠ ডুবিয়ে দেয়, ভেঙে যায় কাঁচা ঘরবাড়ি। তবু মানুষ প্রকৃতিকে শত্রু মনে করে না; বরং তারা জানে, এই জলই আবার পরের মৌসুমে জমিকে উর্বর করে তুলবে। হাওরের সঙ্গে বসবাস করার এই দার্শনিক বোধ পাঁচগাওয়ের মানুষের চরিত্রে এক ধরনের সহনশীলতা তৈরি করেছে।

পাঁচগাও, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা

নদী, খাল আর হাওর পাঁচগাওয়ের পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ষাকালে নৌকা এখানে প্রধান যানবাহন হয়ে ওঠে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, বাজারে যাত্রা—সবই তখন নৌকানির্ভর। এই জলকেন্দ্রিক জীবনধারা একদিকে যেমন রোমান্টিক, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। জলদূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এখন ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় পরিবেশগত সংকট তৈরি করতে পারে।

আধুনিকতা পাঁচগাওয়েও এসে পৌঁছেছে, তবে তা এখনো অসম্পূর্ণ ও দ্বিধামিশ্রিত। বিদ্যুৎ, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট গ্রামের মানুষের জীবনকে কিছুটা সহজ করেছে। তরুণরা এখন দেশের বাইরের খবর জানে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত থাকে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে শহরমুখী অভিবাসনও বাড়ছে। অনেক তরুণ পড়াশোনা বা কাজের জন্য গ্রাম ছাড়ছে, ফলে গ্রামে থেকে যাচ্ছে বয়স্ক ও শিশুদের বড় একটি অংশ। এই পরিবর্তন সামাজিক কাঠামোতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে—কে ধরে রাখবে গ্রামকে, কে এগিয়ে নেবে এর ঐতিহ্য?

তবু পাঁচগাও পুরোপুরি আশাহীন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ছোট ব্যবসা, হাঁস-মুরগি পালন, সবজি চাষ ও মাছের ঘের গড়ে উঠছে। কিছু শিক্ষিত তরুণ আবার গ্রামে ফিরে এসে কৃষিকে আধুনিক পদ্ধতিতে করার চেষ্টা করছে। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, সঠিক সহায়তা ও পরিকল্পনা পেলে পাঁচগাওয়ের মতো গ্রামও টেকসই উন্নয়নের পথ খুঁজে নিতে পারে।

সংস্কৃতির দিক থেকেও পাঁচগাও সমৃদ্ধ। গ্রামীণ গান, পালাগান, বাউল সুর কিংবা গল্প বলার আসর এখন আগের মতো নিয়মিত না হলেও বিশেষ উৎসবে এখনো দেখা যায়। এই সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো শুধু বিনোদন নয়, বরং গ্রামবাসীর পরিচয় ও স্মৃতির বাহক। আধুনিকতার চাপে এগুলো হারিয়ে গেলে পাঁচগাও তার আত্মার একটি বড় অংশ হারাবে—এই উপলব্ধি এখন কিছু মানুষের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে।

পাঁচগাওকে বুঝতে হলে শুধু তার দারিদ্র্য বা সীমাবদ্ধতা দিয়ে নয়, বরং তার সম্ভাবনা দিয়ে দেখতে হয়। এই গ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশ শুধু শহরের গল্প নয়; দেশের আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে এমন অসংখ্য গ্রামে, যেখানে মানুষ এখনো প্রকৃতির সঙ্গে বোঝাপড়ার মাধ্যমে বাঁচে। পাঁচগাও সেই বাস্তবতার এক নীরব সাক্ষ্য।

পাঁচগাও, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা

শেষ পর্যন্ত পাঁচগাও কোনো নিখুঁত জায়গা নয়, কিন্তু এটি সত্যিকারের। এখানে জীবন কঠিন, তবু অর্থপূর্ণ। পাহাড়ের ছায়া, হাওরের জল আর মানুষের শ্রম মিলিয়ে পাঁচগাও এক জীবন্ত পাঠশালা—যেখানে শেখা যায় ধৈর্য, সহাবস্থান এবং সহজ জীবনের গভীর সৌন্দর্য। এই গ্রামকে সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি স্থানকে বাঁচানো নয়; বরং একটি দর্শনকে ধরে রাখা—যেখানে উন্নতি মানে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য।

Leave a Comment